
ঢাকা, ৪ জুলাই ২০২৪: বাংলাদেশে সড়কপথে নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা ও আইন অমান্য করে যানবাহন চলাচলের কারণে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭,৯৫৭টি দুর্ঘটনায় ২,৭৭৮ জন নিহত এবং ১৭,৮২৬ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ, এই সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ জন মানুষ সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন। গবেষণা, সচেতনতা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সেভ দ্য রোড’ তাদের এক প্রতিবেদনে এই ভয়ঙ্কর চিত্র তুলে ধরেছে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুলাই) বিজয় মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সেভ দ্য রোড’-এর মহাসচিব শান্তা ফারজানা এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। তিনি জানান, পদ্মা সেতুর মতো দেশের অন্যান্য সেতু বা সড়কে বাইক লেন না থাকা, বেপরোয়া রাইড শেয়ারিং, লাইসেন্সবিহীন ৩৫০ সিসিসহ দ্রুতগতিসম্পন্ন মোটরসাইকেলের অবাধ চলাচল এবং প্রায় আড়াই লাখ অনুমোদনবিহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিশৃঙ্খলতার কারণে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে দুর্ঘটনা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
শান্তা ফারজানার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনার চিত্র নিম্নরূপ:
এই প্রতিবেদন তৈরিতে দৈনিক যুগান্তর, ইনকিলাব, নয়া দিগন্ত, দিনকাল, প্রথম আলো, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, জনকণ্ঠ, কালবেলাসহ ১৭টি জাতীয় দৈনিক; বাংলাভিশন, আরটিভি, জিটিভি, যমুনা নিউজ, মাছরাঙা, এটিএন বাংলাসহ ২০টি টিভি চ্যানেল; জাগো নিউজ, বাংলা নিউজ, বিডিনিউজসহ ২২টি নিউজ পোর্টাল এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও ‘সেভ দ্য রোড’-এর স্বেচ্ছাসেবকদের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
সেভ দ্য রোড-এর মহাসচিব শান্তা ফারজানা বলেন, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে যে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়েছিল, তা তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রীর অবহেলা ও উস্কানি এবং বিআরটিএ-এর তৎকালীন চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এখনো অব্যাহত আছে। তিনি মনে করেন, ফিটনেসবিহীন বাস, ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন চালক এবং সড়ক শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যর্থতার মূল কারণ হলো সংশ্লিষ্ট সেক্টরে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা দুর্নীতিবাজ আমলা ও শ্রমিক নেতাদের সীমাহীন দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অপরিকল্পিত পদক্ষেপ।
তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে সরকারি সহায়তার মাধ্যমে সমাজ সচেতনতা, গবেষণা ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমের গতি বৃদ্ধির জন্য সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে ‘সেভ দ্য রোড’-এর প্রতিষ্ঠাতা মোমিন মেহেদী আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান:
আকাশ, সড়ক, রেল ও নৌপথ দুর্ঘটনামুক্ত করার জন্য নিবেদিত এই সংগঠনটি গত ১৭ বছর ধরে রাজপথে কাজ করছে এবং দুর্ঘটনাহীন পথের অধিকার রক্ষায় মালিক-শ্রমিক-প্রশাসনিক এবং সাধারণ জনগণের সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়েছে। এ লক্ষ্যে ‘সেভ দ্য রোড’ নিম্নলিখিত ৭ দফা দাবি তুলে ধরেছে:
১. মিরেরসরাই ট্র্যাজেডিতে নিহতদের স্মরণে ১১ জুলাইকে ‘দুর্ঘটনামুক্ত পথ দিবস’ ঘোষণা করতে হবে। ২. ফুটপাত দখলমুক্ত করে যাত্রীদের চলাচলের সুবিধা দিতে হবে। ৩. সড়কপথে ধর্ষণ-হয়রানি রোধে ফিটনেসবিহীন বাহন নিষিদ্ধ করতে হবে এবং কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যতীত চালক-সহযোগী নিয়োগ এবং হেলপার দ্বারা পরিবহন চালানো বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ৪. স্থল, নৌ, রেল ও আকাশপথ দুর্ঘটনায় নিহতদের কমপক্ষে ১০ লাখ ও আহতদের ৩ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ সরকারিভাবে দিতে হবে। ৫. ‘ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স রুল’ বাস্তবায়নের পাশাপাশি ‘ট্রান্সপোর্ট পুলিশ ব্যাটালিয়ন’ বাস্তবায়ন করতে হবে। ৬. পথ দুর্ঘটনার তদন্ত ও সাজা দ্রুত ত্বরান্বিত করে সতর্কতা তৈরি করতে হবে। ট্রান্সপোর্ট পুলিশ ব্যাটালিয়ন গঠনের পূর্ব পর্যন্ত হাইওয়ে পুলিশ, নৌ পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা, সহমর্মিতা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং সকল পথের চালক-শ্রমিক ও যাত্রীদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সকল পরিবহন চালকের লাইসেন্স থাকতে হবে। ৭. ইউ-লুপ বৃদ্ধি, পথ-সেতুসহ সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যাতে ভাঙা পথ, ভাঙা সেতু আর ভাঙা কালভার্টের কারণে আর কোনো প্রাণহানি না ঘটে।
‘সেভ দ্য রোড-এর অঙ্গীকার পথ দূর্ঘটনা থাকবে না আর...’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে ২০০৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে সংগঠনটির পথচলা শুরু হয়েছিল।